মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট উভয়েই চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এবং আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানানোর পর ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা কমে যাওয়ার খবরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের (৬০ পাউন্ড) নিচে নেমে এসেছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৩ জুলাইয়ের পর তেলের দামের এই হার সর্বনিম্ন। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘাত কমানোর পূর্ববর্তী আলোচনাগুলো ব্যর্থ হওয়ায় তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে চালকরা উচ্চ জ্বালানি মূল্যের শিকার হচ্ছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া সফরে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাদের মধ্যে 'খুব ভালো আলোচনা' হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরানও আগ্রহী। অন্যদিকে, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটটি উন্মুক্ত ও বাধামুক্ত রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরান ও ওমানের সঙ্গে প্রণালি দিয়ে আরও জাহাজ চলাচলের বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব শিগগিরই এটি সম্পন্ন হবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যেই চুক্তি হতে পারে। এর ফলে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।
মার্কিন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানালেও, সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা কেমন হবে তার বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই; বরং তারা ওমানের সঙ্গে কথা বলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন মেকানিজম নিয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী কাতারও জানিয়েছে, তারা যুদ্ধের একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে বর্তমানে সরাসরি কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই।
এদিকে, বিবিসি'র মার্কিন সংবাদ অংশীদার সিবিএস নিউজ সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মজুত থাকা দূরপাল্লার নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সংঘাত শুরুর আগে, বিশ্বের মোট দৈনিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালি দিয়ে বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে। এছাড়া গত ২০ জুলাই থেকে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে অবরোধ দিয়ে রেখেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হুথি। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহিত সাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল, তবে গত এক সপ্তাহে নৌযানগুলোতে একের পর এক হামলার খবরে এটি ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ভারতের নৌপরিবহন মন্ত্রী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ইয়েমেন জলসীমার কাছে প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ডুবে যায়। তবে জাহাজে থাকা ১৪ জনের সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজের জন্য হুমকি এখন সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এজে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, একটি টেকসই চুক্তি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা গভীরভাবে সচেতন।
জাহাজ চলাচলে এই ব্যাঘাতের কারণে বিশ্বজুড়েই পাম্পগুলোতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। আরএসি মোটরিং গ্রুপের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে পেট্রোলের দাম এখন সংঘাত শুরুর সময়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতি লিটার পেট্রোলের গড় মূল্য ১.৬০ পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে। ট্রিপল-এ (AAA) এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি পেট্রোল গড়ে ৪ ডলারের ওপরে এবং ডিজেল প্রায় ৫.৪০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। সংঘাত বাড়ার সময় তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, আবার আলোচনার অগ্রগতির খবরে তা দ্রুত কমেও আসে।
উচ্চমূল্যের কারণে বিপি, শেল, শেভরন এবং এক্সন মবিলের মতো বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। তবে হিউসন জানান, বিশাল রাজস্ব আয় সত্ত্বেও তেল কোম্পানিগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলের কাছে একপ্রকার 'অসহায়'। সোমবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এটিই ইরানের "শেষ সুযোগ"। আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করতে তিনি দেশটিতে "বড় ধরনের" হামলা স্থগিত করেছেন বলেও জানিয়েছিলেন।
আলোচনার খবরে তেলের দাম কমা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কিত করপোরেট আয়ের ইতিবাচক ফলাফলের জেরে মঙ্গলবার মার্কিন শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শেষ করেছে। তবে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে, কারণ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই প্রযুক্তির পেছনে তাদের ব্যয় ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
সূত্র: বিবিসি
বার্তা নিউজ/এফএইচআর













