অনেকে এই গণ-অভ্যুত্থানকে চব্বিশের ‘বর্ষা বিপ্লব’ বা ‘দুনিয়া কাঁপানো জুলাই বিপ্লব’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। চিত্র ও বাস্তবতায় ভিন্নতা থাকলেও অনেকেই একে রাশিয়ার ‘অক্টোবর বিপ্লবে’র সঙ্গে তুলনা করেন। বিশিষ্টজনদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন আন্দোলন ও তার পরিণতি এক বিরল ঘটনা। আন্দোলনকারীদের অদম্য সাহসিকতা শুধু প্রশাসনকেই রুখে দেয়নি, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলীয় সরকারকে উৎখাত করে কার্যত নির্বাসনে পাঠিয়েছে; যা জাতিসংঘসহ বিশ্ববিবেককে বিস্মিত করেছে। তবে এসব প্রাপ্তির পাশাপাশি ‘জুলাইয়ের স্বপ্নের বাংলাদেশ কি মানুষ পাচ্ছে?’- এমন একটি প্রশ্নও সামনে আসছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলো কিংবা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা তরুণদের প্রতিদান নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন ও সুখী-সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে এই বিজয়কে বীর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত জাতীয় ঐক্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। দেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি বাংলাদেশ চিরঋণী এবং এখন সেই ঋণ পরিশোধের সময় এসেছে।
শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক নেতারাও নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চারদিকে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাপরিপন্থি। তিনি সবাইকে এই চেতনা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহসী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত জুলাই আন্দোলন অসমাপ্তই থেকে যায়। দেশকে শোষণ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের থাবা থেকে মুক্ত করতে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
দিনটি উদযাপনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ দেশের ৬৪টি জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন। এরপর বেলা ১১টায় বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। দেশের সব জেলাতেও অনুরূপ সংবর্ধনা ও সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিজস্ব কর্মসূচি পালন করছে।
এছাড়া ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশনের মিনিপোলগুলোতে আন্দোলনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। টেলিভিশন ও বেতারে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে বিশেষ আয়োজন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোনাজাত ও প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের প্রধান সড়কগুলো রঙিন নিশান ও জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করার পাশাপাশি আজ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশেরও কথা রয়েছে। সর্বসাধারণের জন্য আজ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। শিশুদের জন্য সব বিনোদনমূলক স্থানও দিনব্যাপী উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে দেশের সব সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশু পরিবার, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
বার্তা নিউজ/এফএইচআর













