ছাত্রজীবন থেকেই জহির রায়হান রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলার সমাবেশ ও ১৪৪ ধারা ভাঙার মিছিলে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন, যে অমূল্য অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে 'জাগো হুয়া সাভেরা' চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের শুরু হয়। এরপর তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে উপহার দিয়েছেন 'জীবন থেকে নেয়া', 'সঙ্গম', 'কাঁচের দেয়াল' ও 'বেহুলা'র মতো কালজয়ী সব মাস্টারপিস। বিশেষ করে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা ও বর্বরতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে তাঁর নির্মিত অনন্য তথ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড' ইতিহাসের এক অনবদ্য দলিল হয়ে আছে।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলা কথাসাহিত্যেও জহির রায়হানের অবদান অসামান্য। 'হাজার বছর ধরে', 'আরেক ফাল্গুন', 'বরফ গলা নদী', 'শেষ বিকেলের মেয়ে' ও 'আর কত দিন'-এর মতো তাঁর রচিত উপন্যাসগুলো আজও পাঠক হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। সাহিত্যকর্মে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার' এবং ১৯৭২ সালে 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করেন।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপরই এক বিয়োগান্তক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় এই মহান শিল্পীকে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হওয়া নিজের বড় ভাই, প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে যান জহির রায়হান। সেখান থেকে তিনি আর কখনও ফিরে আসেননি। স্বাধীনতা ও শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতির এই নির্ভীক সারথিকে।
বার্তা নিউজ/এমএনকে












