অবশেষে সেই খালেই ফিরেছে পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া। আর এ উদ্যোগে শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, নিজেই নেমেছেন খালের ময়লা-আবর্জনার মধ্যে। বলছিলাম রিশালের উজিরপুর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন খালটির কথা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন বরিশালের সহযোগিতায় প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকজুড়ে পরিচালিত হয় ব্যতিক্রমী পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এতে অংশগ্রহণ করেন উজিরপুরের মানবিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আলী সুজা, বিডি ক্লিনের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের সদস্যরা।
শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত চলে এ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি। পাঁচ ঘণ্টার স্বেচ্ছাশ্রমে খালের কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয়। দীর্ঘদিনের অবহেলায় প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়া খালটি ফিরে পেতে শুরু করে নতুন রূপ।
তবে এ কর্মসূচির সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্য ছিল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজার সরাসরি অংশগ্রহণ। বিডি ক্লিনের টি-শার্ট পরে অন্য স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে তিনিও নেমে পড়েন খাল পরিষ্কারের কাজে। একপর্যায়ে কাঁদামাটিতে তিনি আটকে পড়েন। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে তুলে সহযোগিতা করেন। কিন্তু তাতেও থেমে থাকেননি ইউএনও। আবারও নেমে পড়েন ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধভরা খাল পরিষ্কারের কাজে।
তার এই অংশগ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন সরাসরি অংশগ্রহণকে অনেকেই দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
বিডি ক্লিনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জাহেদ ইরফান বলেন, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজার আহ্বানে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও কচুরিপানায় ভরে থাকা খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা এবং স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে ইউএনও মো. আলী সুজা নিজে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করায় সবাই আরও উৎসাহিত হয়েছেন।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ খালের পাশের বাসিন্দাদের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনায় খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোগী হলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আজকের পরিচ্ছন্নতা অভিযান তারই একটি উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, এ কাজে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করতেই একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিজে তাদের সঙ্গে খালের ময়লা-আবর্জনার মধ্যে নেমে কাজ করেছি। পরিচ্ছন্ন উজিরপুর গড়তে আমরা নিজেদের কাজ নিজেরাই করছি। দেশের যেকোনো নাগরিক আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলে নিজের চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব।
তরুণ সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজকে ভালো কাজে সম্পৃক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অলস সময় তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা মাদকাসক্তি, মোবাইলের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল মাহমুদ বাচ্চুসহ একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এভাবে নিজের হাতে খাল পরিষ্কারের কাজে অংশ নিতে দেখে সাধারণ মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেদের বাড়িঘর, পাড়া-মহল্লা ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
উজিরপুরের এই উদ্যোগ কেবল একটি খাল পরিষ্কারের কর্মসূচি নয়; বরং এটি নাগরিক দায়িত্ববোধ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন কর্মকর্তা যখন নিজেই মাঠে নেমে কাজ করেন, তখন সেই দৃশ্য অন্যদেরও দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
ডিবিস/এসডিব্লউএন
.webp)










