এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরি পরিচালিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেলিস্কোপ ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ভিএলটি)-এর কার্যক্রম। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কিনারে ‘কৃত্রিম তারা’ বানিয়ে মহাবিশ্বের নিখুঁত ছবি তোলার লক্ষ্যেই এমন ব্যবস্থা সাজিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
টেলিস্কোপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই মানমন্দিরের চারটি মূল অবকাঠামো থেকে একযোগে আকাশে লেজার ছুড়ে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি শক্তিশালী কয়েকটি লেজার যুক্ত করার পর মোট লেজারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে সাতে। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মহাকাশ দেখতে এই লেজার রশ্মির কাজ কী।
মহাকাশ গবেষণায় প্রধান বাধা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। প্রাণের জন্য এটি আশীর্বাদ হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বড় বিপত্তি। মহাশূন্য থেকে আসা আলো যখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের গ্যাস ভেদ করে ভূপৃষ্ঠের টেলিস্কোপের লেন্সে পৌঁছায়, তখন তা কেঁপে ওঠে এবং ছবি অস্পষ্ট বা ঝাপসা হয়ে যায়। এই সমস্যা কাটাতে বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাডাপ্টিভ অপটিক্স’ নামের একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তিতে টেলিস্কোপের ভেতরে থাকা ছোট একটি বিকৃতিশীল দর্পণ অবিশ্বাস্য গতিতে নিজের আকার বদলে বায়ুমণ্ডলের কারণে আলোর যে বিকৃতি ঘটে, ঠিক সেটির উল্টো রূপ নিয়ে ছবিকে একদম স্থির ও নিখুঁত করে তোলে।
এই প্রক্রিয়া সফল করতে প্রয়োজন হয় একটি উজ্জ্বল রেফারেন্স তারা, যার আলোর ওপর ভিত্তি করে প্রযুক্তিটি বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি হিসাব করতে পারে। আকাশে সব সময় পর্যাপ্ত উজ্জ্বল প্রাকৃতিক তারা খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক তখনই রাতের আকাশে লেজার ছুড়ে কৃত্রিম তারা তৈরি করেন গবেষকরা। ভূমি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার বা ৫৬ মাইল ওপরে থাকা বায়ুমণ্ডলের সোডিয়াম স্তরে এই লেজার গিয়ে ধাক্কা দিলে সেখানকার সোডিয়াম পরমাণুগুলো উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়াতে শুরু করে। দূর থেকে এই আলো অবিকল একটি জ্বলজ্বলে তারার মতোই কাজ করে, যা টেলিস্কোপকে বায়ুমণ্ডলের কম্পন শুধরে নেওয়ার সঠিক মানচিত্র এঁকে দেয়।
লেজারের এই ধারণাটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত স্যাটেলাইটের গতিবিধি শনাক্ত করার মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি থেকে এসেছে। তবে একসময় এই লেজার প্রস্তুত করা বিপজ্জনক ও রাসায়নিক নির্ভর হলেও এখন বিজ্ঞানীদের একটি বোতামের চাপেই কাজ হয়ে যায়। প্রতিটি লেজারের আলো এতটাই শক্তিশালী যে তা সাধারণ লেজার পয়েন্টারের চেয়ে অন্তত চার হাজার গুণ বেশি ক্ষমতাধর।
সবচেয়ে বড় চমক হলো, মানমন্দিরের চারটি প্রধান টেলিস্কোপ তাদের নিজস্ব লেজার একযোগে পরিচালনা করে কার্যত একটি বিশাল ‘ভার্চুয়াল’ টেলিস্কোপ হিসেবে কাজ শুরু করেছে। এতে মহাকাশের বহুদূর পর্যন্ত আগের চেয়ে বহুগুণ স্পষ্ট ও পরিষ্কার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা সম্ভব হচ্ছে। সূর্যজগতের বাইরের কোনো গ্রহের প্রথম ছবি তোলা কিংবা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলার মতো ঐতিহাসিক গবেষণায় ভিএলটি বড় ভূমিকা রেখেছে।
আকাশের দিকে এমন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার থাকায় বিমান চলাচলে কোনো ঝুঁকি তৈরি হয় কি না, এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা হয়নি। স্বয়ংক্রিয় সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক আকাশ নজরদারিতে রাখা হয়। আকাশে কোনো বিমানের গতিবিধি ধরা পড়ামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজারগুলো বন্ধ হয়ে যায়, ফলে পাইলটের চোখ ধাঁধানো বা বড় দুর্ঘটনার কোনো আশঙ্কাই থাকে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই কৃত্রিম তারা এখন পৃথিবীর মাটিতে বসেই দূর মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে খুলে দিচ্ছে নতুন দিগন্ত।
সূত্র: বিবিসি
বার্তা নিউজ/ এসভিএন






.webp)







