এই দুই দলের বিশ্বকাপ লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল ১৯৬২ সালে। এরপর থেকে মাঠে অসাধারণ সব গোল, বিতর্ক আর লাল কার্ডের পাশাপাশি মাঠের বাইরের রাজনৈতিক উত্তেজনাও এই দ্বৈরথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আশির দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কে বড় ছাপ ফেলে, যা এখনো আর্জেন্টাইনদের ফুটবল গানে শোনা যায়। ঐতিহাসিক এই সেমিফাইনালের আগে বিবিসি স্পোর্টস দল দুটির ছয় দশকের পুরোনো বৈরিতার ইতিহাস ফিরে দেখেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে পাঁচবারের দেখায় ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাদের জয়ের স্মৃতি বেশ পুরোনো। ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে তাদের দেখা না হওয়ায় অনেক তরুণ ভক্তের কাছেই এই বৈরিতা অপরিচিত মনে হতে পারে।
এই দুই দলের প্রথম দেখা হয় ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে। সেই ম্যাচে রন ফ্লাওয়ারস, ববি চার্লটন এবং জিমি গ্রিভসের গোলে ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে। দুই দলই গ্রুপ পর্বে একটি করে জয়, ড্র ও হার নিয়ে শেষ করলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে পরের পর্বে যায় ইংলিশরা। এরপর ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের মুখোমুখি লড়াইটি প্রকৃত বৈরিতার জন্ম দেয়। ১-০ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের জেতা সেই ম্যাচে জিওফ হার্স্টের করা জয়সূচক গোলটি অফসাইড ছিল বলে আর্জেন্টিনা আজও দাবি করে। তবে বিতর্কের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় যখন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাত্র ৩৩ মিনিটে মাঠ ছাড়তে হয়। ববি চার্লটনকে ফাউল করা এবং জার্মান রেফারির সাথে তর্কে জড়ানোর কারণে তাকে বহিষ্কার করা হলে তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রায় আট মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। ইংল্যান্ডের সেসময়ের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং খেলোয়াড়দের জার্সি বদল করতে নিষেধ করেছিলেন। এই ম্যাচের পর থেকেই মূলত ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। উল্লেখ্য, শনিবার ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন সেই রাত্তিন।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর এই দুই দেশ ফের মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চরমে থাকা অবস্থায় এই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি করেন। ইংল্যান্ডের গোলকিপার পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে হাত দিয়ে করা সেই গোলের পর ম্যারাডোনা ইংলিশদের অর্ধেক দলকে কাটিয়ে যে জাদুকরী দ্বিতীয় গোলটি করেন, তাকে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ গোল হিসেবে ধরা হয়। গ্যারি লিনেকার একটি গোল শোধ করলেও ২-১ ব্যবধানে হেরে ইংল্যান্ড বিদায় নেয় এবং আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে। ২০০৫ সালে ম্যারাডোনা প্রথম গোলের জন্য ক্ষমা চাইলেও শিলটন তা প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটি ডেভিড বেকহ্যামের জন্য চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখার কারণে তাকে ওই ম্যাচে খলনায়ক হতে হয়েছিল। গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও অ্যালান শিয়ারারের পেনাল্টি গোলের পর মাইকেল ওয়েন এক দুর্দান্ত একক গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। পরে হাভিয়ের জানেত্তি গোল শোধ করলে নির্ধারিত সময় ২-২ সমতায় শেষ হয়। সল ক্যাম্পবেলের একটি গোল বাতিল হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ডেভিড ব্যাটি ও পল ইন্সের ব্যর্থতায় আর্জেন্টিনা ৪-৩ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এক বছর পর সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে রেফারিকে ধোঁকা দিয়ে ওই লাল কার্ডটি আদায় করেছিলেন।
তবে ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে বেকহ্যাম তার পুরোনো ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ পান। সাপোরো ডোমে গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে মাউরিসিও পচেত্তিনো ডি বক্সে মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। সেই স্পটকিক থেকে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করে দলকে ১-০ ব্যবধানের জয় এনে দেন তৎকালীন ইংলিশ অধিনায়ক বেকহ্যাম। এই হারের পর সুইডেনের সাথে ড্র করে ১৯৬২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। সেই উত্তেজনায় ভরপুর ম্যাচের পর দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর।
বার্তা নিউজ/এফএইচআর













