ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংকট থেকে বের হতে, নিজেদের সম্মান বাঁচাতে বা আমেরিকার ভাবমূর্তি রক্ষায় যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছেন, তখনই তারা আরও বড় বিপদে পড়েছেন। ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক সময় অনীহা সত্ত্বেও এমনটা ঘটেছিল, বিশেষ করে যখন যুদ্ধগুলো জেতার কোনো উপায় ছিল না। এখন ট্রাম্পও প্রথমবারের মতো এমন এক ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন, যেখানে ইরান আত্মসমর্পণ বা আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যদি এভাবে ব্যর্থ হতে থাকে, তবে ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, তিনি কি বর্তমান অনিষ্পন্ন বিমান হামলা, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও নৌ-অবরোধের নীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে যাবেন? নাকি দ্বিতীয়ত, তিনি আরও কঠোর হবেন এবং শুধু সামরিক নয়, বরং ইরানের বেসামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে স্থলবাহিনী ব্যবহারের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেবেন? তৃতীয় এবং সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক বিকল্পটি হতে পারে—নিজের ক্ষতি মেনে নিয়ে লক্ষ্য পূরণ ছাড়াই যুদ্ধ থেকে সরে আসা। প্রতিটি বিকল্পেরই রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে কঠিন জবাব রয়েছে, যা প্রমাণ করে কেন তিনি এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন যা জেতা বা হারা, কোনোটিই তার সামর্থ্যে নেই। পেন্টাগন সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে ইরানকে শাস্তির নতুন উপায় জানতে চেয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি ইরান ট্রাম্পের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি, তাই সপ্তাহান্তে প্রতিশ্রুত বিধ্বংসী হামলা স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর তিনি ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে ‘অবিশ্বাস্য রকম প্রতারণাপূর্ণ’ বলে আক্রমণ করেন এবং একই দিন ওভাল অফিসে আবার হুমকি দিয়ে বলেন, একটি ভালো চুক্তিতে সই করার জন্য এটাই তাদের শেষ সুযোগ। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে ‘মাথাবিহীন’ করার হুমকি দেন, তবে ইরান যদি এই হুমকি আবারও উপেক্ষা করে তবে তিনি কী করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ট্রাম্প যদি সংঘাত আরও বাড়ান, তবে তা বিশাল এক জুয়া হবে, কারণ বোমা মেরে তেহরানকে আলোচনায় ফেরানো যাবে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামোতে হামলা করে, তবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের একই ধরনের স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাতে পারে, যা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়াবে। আঞ্চলিক নেতারা ট্রাম্পের কাছে এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন বলেও জানা গেছে। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার তাকে ফোন করে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ করেছিল।
তাত্ত্বিকভাবে ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দিতে পারতেন, তবে এতে মার্কিন জাহাজগুলো মিসাইল ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ত। আবার খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র বা হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানি বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য স্থল অভিযান অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী হতে পারে। গত ৬০ বছরের ইতিহাস বলে, যখনই আকাশপথে আক্রমণ থেকে স্থলযুদ্ধে রূপ নেয়, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ আমেরিকানদের কাছে তখন যুদ্ধের চেহারা ভিন্ন মনে হয়, কারণ প্রাণহানি বাড়লে রাজনৈতিক ক্ষতিও বাড়ে, যা নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের জন্য একেবারেই কাম্য নয়। আর যখন সেনা মৃত্যুর পরও শুধু সম্মান বাঁচাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হয়, তখন তা আরও দীর্ঘায়িত হয়।
অতীতের অনেক প্রেসিডেন্টই ট্রাম্পের মতো এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিলেন। ভিয়েতনাম, ইরাক বা আফগানিস্তানের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, শেষ পর্যন্ত এগুলো সব ‘খারাপ পরিস্থিতি, সংঘাত বাড়ানো বা বেরিয়ে যাওয়া’—এই তিনটি অপশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর কোনো প্রেসিডেন্টই যুদ্ধ হেরে যাওয়ার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান না।
১৯৬৫ সালে লিন্ডন বি. জনসনও ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে একই ধরনের সংকটে ভুগেছিলেন। তিনি সে সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারাকে বলেছিলেন, ‘পরাজয়ের চেয়ে খারাপ আর কিছুই হতে পারে না, আবার জেতারও কোনো উপায় আমি দেখছি না।’ এরপরও তিনি ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ শুরু করেন এবং হাজার হাজার তরুণ সেনাকে যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দেন। আন্ডার সেক্রেটারি জর্জ বল তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, এতে আমেরিকার ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এবং সম্মানহানি ঘটবে, তাই একটি আপস সমাধান খোঁজা উচিত। কিন্তু জনসন শোনেননি, যার ফলে তার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
রিচার্ড নিক্সন পরবর্তীতে যুদ্ধ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন এবং বিজয় অসম্ভব জেনেও সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার আশায় যুদ্ধ চালিয়ে যান। এরপর জর্জ ডব্লিউ বুশও ২০০৭ সালে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে বলেছিলেন, "ইরাকে ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় হবে।" তিনি আরও হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন, যা নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। বারাক ওবামাও যুদ্ধ শেষের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও আফগানিস্তানে তালেবান ও আল কায়েদাকে রুখতে সেনা বাড়িয়েছিলেন।
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন ‘কখনো শেষ না হওয়া যুদ্ধ’ এবং ‘না জেতা যুদ্ধগুলোর’ কড়া সমালোচনা করেই হোয়াইট হাউসের ক্ষমতায় এসেছিলেন। অথচ নিজের প্রথম মেয়াদেই যুদ্ধ শেষ করার অজুহাতে তিনি আফগানিস্তানে সেনা বাড়িয়েছিলেন, যার দায় পরে তিনি সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসের ওপর চাপান। এখন ট্রাম্প আবারও এমন এক নিঃসঙ্গ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যা ২০১৭ সালে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘ওভাল অফিসের ডেস্কে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সম্পূর্ণ আলাদা।’ ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ বুশের নয়, এটি ট্রাম্পের নিজের যুদ্ধ, যা তার উত্তরাধিকার এবং হোয়াইট হাউসের বাইরে আরও অসংখ্য মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
সূত্র: সিএনএন
বার্তা নিউজ/এফএইচআর











