কখনো তিনি ভালোবাসার কবি, কখনো প্রতিবাদের অগ্নিকণ্ঠ, আবার কখনো সমাজের শোষণ, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক আপসহীন উচ্চারণ। মাত্র ৩৪ বছরের জীবনেই বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বাংলা সাহিত্যের এই প্রতিবাদী রোমান্টিক কবির ৭০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৫৬ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সাহেবের মেঠ গ্রামে। অল্প বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও কবিতার শক্তি, আবেগ ও প্রতিবাদী উচ্চারণে আজও পাঠকের কাছে জীবন্ত রুদ্র।
বাংলা কবিতায় প্রেমকে নতুন ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। তাঁর কাছে প্রেম কেবল ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় ছিল না; প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের বেঁচে থাকা, বিচ্ছেদ, প্রত্যাশা, বেদনা এবং গভীর মানবিক অনুভূতি।
তাঁর লেখা ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও গানটি নতুন প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যক্তিগত ভালোবাসার অনুভূতিকে সর্বজনীন আবেগে রূপ দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
রুদ্রের প্রেমের কবিতায় যেমন রয়েছে আকুলতা, তেমনি রয়েছে বিচ্ছেদের গভীর বেদনা। তাঁর শব্দচয়ন, উপমা ও আবেগের প্রকাশ বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছে।
প্রেমের পাশাপাশি প্রতিবাদ ছিল রুদ্রের কাব্যচর্চার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্যায়, শোষণ এবং মানুষের অধিকারবঞ্চনার চিত্র উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়।
বিশেষ করে ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতি কবির গভীর ক্ষোভ ও বেদনার প্রকাশ ঘটেছে।
সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক মূল্যবোধের সংকট তাঁকে বারবার আলোড়িত করেছে। ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে কখনো প্রতিবাদের ভাষা, কখনো বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘প্রতিবাদী রোমান্টিক’ কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শৈশবের উল্লেখযোগ্য সময় কাটে বাগেরহাটের মোংলা অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকায় পড়াশোনা করেন। ঢাকা ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল ও ঢাকা কলেজে শিক্ষাজীবন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন তিনি। কবিতা লেখা, আবৃত্তি এবং সাহিত্যিক আড্ডায় তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে সমসাময়িক তরুণ কবিদের মধ্যে পরিচিত করে তোলে।
সত্তরের দশকে বাংলা কবিতার অঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূল’। বইটি প্রকাশের পরই কবি হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর পাঠকের নজরে আসে।
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ (১৯৮১), ‘মানুষের মানচিত্র’ (১৯৮৪), ‘ছোবল’ (১৯৮৬), ‘গল্প’ (১৯৮৭), ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ (১৯৮৮) এবং ‘মৌলিক মুখোশ’ (১৯৯০)।
এসব কাব্যগ্রন্থে প্রেম, মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক অসংগতি, স্বাধীনতার চেতনা এবং প্রতিবাদের বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে।
রুদ্রের ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৯৮২ সালে। তবে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮৬ সালে বিচ্ছেদ ঘটে।
ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম, বিচ্ছেদ ও বেদনার অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে আলোচিত হলেও রুদ্রের সৃষ্টিশীলতাকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিসরে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল তাঁর কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
১৯৯১ সালের ২১ জুন ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৪ বছর।
জীবনের দৈর্ঘ্য খুব বেশি না হলেও সাহিত্যিক অবদানের কারণে তিনি বাংলা কবিতায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর কবিতা আজও পাঠ করা হয় সাহিত্যসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আবৃত্তির মঞ্চে।
বাগেরহাটের মোংলায় কবির স্মৃতি ধরে রাখতে গড়ে উঠেছে ‘রুদ্র স্মৃতি সংসদ’। তাঁর স্মরণে আয়োজিত হয় ‘রুদ্র মেলা’। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। মৃত্যুর ৩৩ বছর পর রাষ্ট্রীয় এই সম্মাননা তাঁর সাহিত্যিক অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
তাঁর সৃষ্টিকর্ম কেবল একটি সময়ের সাহিত্যিক দলিল নয়, বরং প্রেম, প্রতিবাদ ও মানবিকতার এমন এক প্রকাশ, যা সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।
সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, বেদনা, প্রতিবাদ আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আজও একইভাবে প্রবহমান। সেই অনুভূতির ভেতরেই বেঁচে আছেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
তাঁর কবিতার ভাষা কখনো কোমল, কখনো তীক্ষ্ণ; কখনো প্রেমিকের আকুতি, কখনো প্রতিবাদীর বজ্রকণ্ঠ। এ দুই বিপরীত অনুভূতিকে একই কাব্যসত্তায় ধারণ করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্য আজও পাঠকের কাছে আবেদনময়।
৭০তম জন্মবার্ষিকীতে কবিকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রয়াত সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর কবিতায় উচ্চারিত মানবিকতা, স্বাধীনতার চেতনা, প্রেম ও প্রতিবাদের মূল্যবোধকে নতুন করে উপলব্ধি করা।
বাংলা কবিতার আকাশে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাই কেবল একটি নাম নন, তিনি ভালোবাসা ও প্রতিবাদের এক অবিনাশী উচ্চারণ।
বার্তা নিউজ/এমএনকে














