প্রতি কাপ ‘দ্যা হং পাও’ চায়ের দাম পড়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা।
বিরলপ্রজাতির এই চা উৎপন্ন হয় কেবলমাত্র চীনের উত্তর ফুজিয়ান প্রদেশের উয়ি পর্বতে। ধারণা করা হয় এটি চায়ের একটি বুনো প্রজাতি। উয়ি পর্বতের পাথুরে মাটিই এই চা গাছ জন্মানোর উপযুক্ত স্থান। ফলে এই চা উৎপাদনের একমাত্র ভরসা প্রাকৃতিক পরিবেশ।
এই চায়ের বিশেষত্ব- এর বিশেষ স্বাদ এবং গন্ধ। টকটকে লাল রঙের এই চা পান করার পর দীর্ঘক্ষণ মুখে লেগে থাকে ফুলের সুবাস। কিন্তু এই চায়ের আসল স্বাদ পেতে হলে চা গাছের বয়স হতে হবে অন্তত ৩০০ বছর। বয়স যত বাড়বে এই চায়ের স্বাদ ও তত বাড়বে। ধারণা করা হয় এই স্বাদ ও গন্ধের মূল কারণ উয়ি পর্বতমালার লৌহ সমৃদ্ধ বিশেষ পাথুরে মাটি এবং বিশেষ মিনারেল সমৃদ্ধ পানি।
বিশ্ব বাজারে সবচেয়ে দামি চায়ের মর্যাদা পায় ‘দ্যা হং পাও’। এর অন্যতম কারণ এর বয়স এবং জন্মানোর বিশেষ অঞ্চল। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও খুব অল্প পরিমাণে উৎপাদন করা হয় এই চা। বিশেষ এই চায়ের বাণিজ্যিক চাষের জোর চেষ্টা চলছে। তবে সেই চায়ের স্বাদ আসল ‘দ্যা হং পাও’চায়ের কাছাকাছিও নয়। কেবল বয়েসী গাছ থেকেই এই চায়ের আসল স্বাদ পাওয়া যায়।
‘দ্যা হং পাও’ চা আবিষ্কারের সাথে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু গল্প। মোঙ্গলদের এক রাজার মায়ের ভয়াবহ অসুখ সারাতে এক কবিরাজ পথ্য হিসেবে প্রথম ব্যবহার করে ছিলেন এই চা। এই চা পান করেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন রাজার মা। রাজা লাল একটি জামা পরিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন সেই গাছটিকে।
আরও একটি কিংবদন্তি রয়েছে ‘দ্যা হং পাও’ চা আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে। একবার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে এক পণ্ডিত একটি বন্য চা গাছ থেকে কিছু পাতা ছিঁড়ে চা তৈরি করে পান করেন। কঠিন সেই পরীক্ষায় সে বছর কেবল তিনিই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ওই পণ্ডিত তার মর্যাদাপূর্ণ লাল পোশাকটি জড়িয়ে দেন ওই ঝোঁপের গায়ে। অনেকেই তাই বিশেষ এই চা গাছটিকে বিগ রেড রোব বা লাল আলখেল্লা বলে ডাকে।
গোটা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র চীনেই ‘দ্যা হং পাও’ চায়ের ছয়টি পরিপক্ক গাছ রয়েছে। ২০০৬ সালে চীন সরকার প্রায় ১১৭ কোটি টাকার বিমা করিয়েছিলেন এই ছয়টি চা গাছের জন্য। এই চায়ের প্রতি কেজির দাম প্রায় ৮ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা।
ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০০ বছর ধরে চীনে চাষ হচ্ছে ‘দ্যা হং পাও’ চায়ের। সাধারণত মে-জুন মাসে ২-৩টি পাতাসহ এই চা সংগ্রহ করা হয়। বাছাই করা চায়ের পাতাগুলো শুকানো হয় সূর্যের তাপে। ঠাণ্ডা হলে পাতাগুলোকে চালনিতে চেলে নেয়া হয়।
শুকানোর পর ‘দ্যা হং পাও’ চা দেখতে অনেকটা শক্তভাবে গিঁটযুক্ত দড়ি বা সামান্য বাঁকানো স্ট্রিপের মতো দেখায়। তখন এর রং হয় অনেকটা সবুজ এবং বাদামীর মিশেল। প্রক্রিয়াজাত শেষ হওয়ার পর এই চায়ের রং হয় অনেকটা পরিষ্কার কমলা-হলুদ। এরপর এই চা কে ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়।
‘দ্যা হং পাও’ চায়ে রয়েছে ক্যাফিন, থিওফিলিন, পলিফেনলস এবং ফ্ল্যাবোনয়েড। এই উপাদানগুলো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। ‘দ্যা হং পাও’ পান করলে ক্লান্তি কমে, বাড়ে রক্ত সঞ্চালন। এই চা শরীরের পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়াও এই চা নিয়মিত পান করলে মদ্যপান এবং ধূমপানের খারাপ প্রভাব অকেটা কমে। প্রসাধনী তৈরিতেও ব্যবহার আছে এই চায়ের। নিয়মিত ‘দ্যা হং পাও’ পান করলে ত্বক ভালো থাকে। ওজন কমানো, কাশির উপশমেও বেশ কার্যকর এটি। আর এই চা তৈরি করতে হয় মাটির পাত্রে।
চায়ের উৎপত্তিস্থল চীন। অনেক জাতের চা থাকলেও ‘দ্যা হং পাও’ কেই চীনা চায়ের মূল উৎস বিবেচনা করা হয়। বহু বছর ধরে এই চা সংরক্ষিত ছিল চীনের সবচেয়ে অভিজাতদের জন্য। চীন তার রাষ্ট্রিয় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য ব্যবহার করতেন ‘দ্যা হং পাও’ চা।
তবে সম্প্রতি বাজারে এসেছে বাংলাদেশের সিলেটে উৎপাদিত বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা ‘গোল্ডেন বেঙ্গল’। ২০২২ সালের মে মাস নাগাদ বিশ্বের দামি এই চা বাজারে আসবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'লন্ডন টি এক্সচেঞ্জ' প্রতি কেজি চায়ের দাম নির্ধারণ করেছেন ১৪ লক্ষ পাউন্ড। বাংলাদেশি টাকার হিসেবে যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা।
চীনের সময় শেষ, ‘দ্যা হং পাও’ নয় ‘গোল্ডেন বেঙ্গল’ এখন বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা। যদিও ‘গোল্ডেন বেঙ্গল’ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নয়, এতে দেয়া আছে ২৪ ক্যারটের সোনার প্রলেপ।













