আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা ও অবহেলার জরিমানা
১. রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জরিমানা (ধারা ২৬৬):
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।
• নতুন করদাতাদের ক্ষেত্রে (যাঁদের আগে কখনো কর নিরূপণ হয়নি) সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
• পূর্বে কর নির্ধারিত হয়েছে এমন করদাতাদের ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ (সর্বনিম্ন ১,০০০ টাকা) জরিমানা হতে পারে।
• এ ছাড়াও, ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা করে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে।
২. রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (Proof of Submission of Return - PSR) প্রদানে ব্যর্থতা (ধারা ২৬৪):
ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ, জমি বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি, সঞ্চয়পত্র ক্রয়সহ প্রায় ৪৫ ধরনের নাগরিক সেবা পেতে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই প্রমাণ বা সনদ প্রদানে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমোদন দিতে বাধ্য নয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উপকর কমিশনার অনধিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন।
৩. ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রদর্শন না করা (ধারা ২৬৫):
যাঁদের আয়ের উৎস ব্যবসা, তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য স্থানে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রদর্শন করতে হয়। এই নিয়ম না মানলে ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
৪. আয় গোপন বা অসত্য তথ্য প্রদান (ধারা ২৭২):
রিটার্নে ইচ্ছাকৃতভাবে আয় গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলে ধারা ২৭২ অনুযায়ী কঠোর জরিমানার মুখে পড়তে হয়। ফাঁকি দেওয়া করের অঙ্ক ও সংশ্লিষ্ট বছরগুলো বিবেচনা করে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে জরিমানা ধার্য করা হতে পারে।
৫. কর ফাঁকি দেওয়ার দায়ে ফৌজদারি শাস্তি (ধারা ৩১২):
যদি কোনো করদাতা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা করেন, তবে আয়কর আইন অনুযায়ী ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আইনি বিধান রয়েছে।
জরিমানার বাইরে অন্যান্য আইনি ও সামাজিক পরিণতি
জরিমানার অংক ছাড়াও সময়মতো রিটার্ন না দিলে করদাতাকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়:
• কর রেয়াত হারানো: নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন না দিলে সঞ্চয়পত্র, জীবন বিমা প্রিমিয়াম বা সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলে (GPF) বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়া যায় না।
• উৎসে কাটা কর (TDS) সমন্বয় না হওয়া: অগ্রিম আয়কর বা উৎস থেকে কাটা কর সময়মতো রিটার্ন দিয়ে সমন্বয় না করলে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের ঝুঁকি তৈরি হয়।
• সেবা প্রাপ্তিতে বাধা: পাসপোর্ট নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স হালনাগাদ, ব্যাংক থেকে ঋণ বা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সুবিধা গ্রহণ স্থগিত বা আটকে যেতে পারে।
• বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ সংক্রান্ত কঠোরতা: ক্ষেত্রবিশেষে গুরুতর অবহেলা ও দীর্ঘমেয়াদী কর ফাঁকির ক্ষেত্রে সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও থাকে।
আয়কর দেওয়া কোনো করুণা নয়, এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। অযথা অবহেলা করে জরিমানা কিংবা আইনি জটিলতা ডেকে আনার চেয়ে সচেতনভাবে সঠিক সময়ে রিটার্ন দাখিল করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) যেমন হয়রানিমুক্ত ও সহজ অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি করদাতাদেরও নিজ থেকেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
লেখক: হারুন রশিদ
অ্যাকাউন্টিং, ভ্যাট ও ট্যাক্সবিষয়ক পেশাজীবী














